তিনতলার কার্নিশ থেকে জাওয়াদ যখন নিচে ঝাঁপ দিল, বাতাসের ঝাপটা তার মুখে আছড়ে পড়ল। নিচে রাখা একটি পুরোনো পাটের বস্তার স্তূপের ওপর সে আছড়ে পড়ল। পিঠের ব্যথায় মুহূর্তের জন্য তার দম আটকে এল, কিন্তু থামার উপায় নেই। ওপর থেকে কর্কশ কণ্ঠে চিৎকার শোনা যাচ্ছে— "ওকে ধর! পেনড্রাইভটা ওর কাছে!"
জাওয়াদ টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল। ডক্টর আশরাফের
দেওয়া রুপালি পেনড্রাইভটা তার মুঠোর ভেতর শক্ত করে ধরা। এটি এখন কেবল একটি যন্ত্র
নয়, বরং পুরো উম্মাহর আমানত।
পেছনের সরু গলিতে বুট জুতোর শব্দ প্রতিধ্বনিত
হচ্ছে। অন্তত চারজন সশস্ত্র লোক তার পিছু নিয়েছে। জাওয়াদ পুরানো ঢাকার অলিগলি
ভালো চেনে। সে দ্রুত একটি ভাঙা ইটের দেয়াল টপকে পাশের গলিটিতে ঢুকল। ঘুটঘুটে
অন্ধকার, কেবল দূরে একটি টিমটিমে ল্যাম্পপোস্টের আলো কাঁপছে।
"ডানে যাও! ওদিকে কোনো রাস্তা নেই!" পেছন
থেকে তাড়া করা লোকগুলোর একজন উচ্চস্বরে নির্দেশ দিল।
জাওয়াদ দেখল সামনে সত্যিই একটি বিশাল লোহার
গেট, যা তালাবদ্ধ। সে আটকা পড়েছে। পেছনে শত্রুদের টর্চলাইটের আলো ক্রমশ
কাছে আসছে। জাওয়াদের কপালে ঘাম জমেছে। সে পকেট থেকে একটি ছোট লেজার টর্চ বের করল,
কিন্তু
ওটা দিয়ে তালা ভাঙা অসম্ভব।
"ইয়া আল্লাহ, আমাকে পথ দেখান,"
জাওয়াদ
বিড়বিড় করল। বিপদের মুহূর্তে এটাই তার আসল শক্তি— 'তাওয়াক্কুল'।
হঠাৎ অন্ধকার ছায়ার ভেতর থেকে একটি চাপা কণ্ঠ
শোনা গেল, "এদিকে এসো, জাওয়াদ! নিচু
হও!"
জাওয়াদ চমকে উঠল। কে এই লোক? অন্ধকার
কোণ থেকে একটি হাত বেরিয়ে এসে তাকে পাশের একটি সরু সুড়ঙ্গ সদৃশ নর্দমার ঢাকনার
দিকে টেনে নিল। জাওয়াদ দ্বিধা না করে সেই ছায়ামূর্তির পিছু নিল। তারা স্লাইড করে
একটি ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়ল। ঠিক সেই মুহূর্তে ওপরের গলিতে শত্রুরা এসে
পৌঁছাল।
"কোথায় গেল ও? এখানেই তো
ছিল!" ওপর থেকে ক্ষিপ্ত কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
সুড়ঙ্গের ভেতরটা স্যাঁতসেঁতে। জাওয়াদের সামনে
থাকা লোকটি একটি কালো হুডি পরে আছে, মুখ দেখা যাচ্ছে না। লোকটির চলাফেরা
অত্যন্ত ক্ষিপ্র এবং কৌশলী।
"আপনি কে?" জাওয়াদ নিচু
স্বরে জিজ্ঞেস করল।
"বন্ধুর বন্ধু," লোকটি সংক্ষিপ্ত
উত্তর দিল। তার হাতের কবজিতে একটি বিশেষ ট্যাটু— একটি খোলা তলোয়ারের ওপর কোরআনের
আয়াত খোদাই করা। জাওয়াদ বুঝতে পারল, এই ব্যক্তি কোনো সাধারণ মানুষ নয়। হতে
পারে সে কোনো গোপন নিরাপত্তা সংস্থার সদস্য যারা এই ষড়যন্ত্রের কথা আগে থেকেই
জানে।
সুড়ঙ্গ দিয়ে প্রায় পাঁচ মিনিট হাঁটার পর
তারা একটি পুরোনো গুদামের ভেতরে বের হলো। হুডি পরা লোকটি থামল। সে পকেট থেকে একটি
ছোট স্ক্যানার বের করে জাওয়াদের দেহ পরীক্ষা করল।
"কোনো ট্র্যাকার নেই, তুমি নিরাপদ,"
লোকটি
বলল। "কিন্তু ওই পেনড্রাইভটা বিপদের মূল উৎস। মোসাদের এই সেলটি (Cell)
শুধু
ডক্টর আশরাফকে চায় না, তারা চায় এই এনক্রিপশন কোড ব্যবহার করে
মধ্যপ্রাচ্যের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে।"
জাওয়াদ অবাক হয়ে লোকটির দিকে তাকাল।
"আপনি এসব জানলেন কীভাবে?"
লোকটি তার হুডটা সরাল। এক যুবক মুখ, চোখে
গভীর দেশপ্রেমের ছাপ। "আমি মাহিন। গোয়েন্দা বিভাগের 'আহলে হক'
ইউনিটের
সদস্য। আমরা এই ছদ্মবেশী ইমামের ওপর অনেকদিন ধরে নজর রাখছিলাম।"
হঠাৎ গুদামের বাইরে একটি হেলিকপ্টারের ইঞ্জিনের
শব্দ শোনা গেল। সেই সাথে ভারী ট্রাকের শব্দ।
"ওরা আমাদের লোকেশন ট্রেস করে ফেলেছে!"
মাহিন দ্রুত তার পিস্তল বের করল। "জাওয়াদ, তোমাকে এখনই
এখান থেকে বের হতে হবে। ওই পেনড্রাইভটি লালবাগের একটি নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে
দিতে হবে। আমি ওদের আটকে দিচ্ছি।"
"কিন্তু আমি আপনাকে বিপদে রেখে যাব না!"
জাওয়াদ দৃঢ়ভাবে বলল। তার ভেতরের 'ইনসাফ' বোধ তাকে একা
পালাতে বাধা দিচ্ছে।
"এটা তোমার মিশন নয় জাওয়াদ, এটা
আমানত রক্ষার যুদ্ধ। যাও!" মাহিন তাকে পেছনের একটি ছোট দরজার দিকে ঠেলে দিল।
বাইরে তখন গুলির শব্দ শুরু হয়েছে। জাওয়াদ
বুঝল, তাকে আরও বড় বিপদের মোকাবিলা করতে হবে। সে যখন গুদামের পেছনের দরজা
দিয়ে বের হলো, দেখল সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই ছদ্মবেশী 'ইমাম',
তার
হাতে একটি রিমোট কন্ট্রোলড ড্রোন, যা থেকে নীল রঙের রশ্মি নির্গত হচ্ছে।
"অনেক দৌঁড়েছ কিশোর," লোকটি
নিষ্ঠুরভাবে হাসল। "এবার শেষ বিদায়ের জন্য প্রস্তুত হও।"
জাওয়াদ কি পারবে ড্রোনটির আক্রমণ থেকে বাঁচতে?
মাহিন
কি পারবে গুদামের ভেতর একা শত্রুদের রুখে দিতে?
পরবর্তী অধ্যায়ে আসছেঃ প্রযুক্তির লড়াই ও লালবাগের সেই রহস্যময়
ঠিকানা।
[এই উপন্যাসে বর্ণিত সকল চরিত্র, স্থান এবং ঘটনাবলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বাস্তবের কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে এর কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। কাহিনীর প্রয়োজনে কিছু গোয়েন্দা কৌশল ও প্রযুক্তির উল্লেখ করা হয়েছে, যা নিছক বিনোদনের উদ্দেশ্যে রচিত। গল্পের অলঙ্করণে ব্যবহৃত ফিচার ইমেজের কোনো চরিত্রের সাথে যদি কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তির চেহারার মিল পাওয়া যায়, তবে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত এবং কাকতালীয়। লেখক কোনো উগ্রতা বা সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেন না; বরং বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই এবং নৈতিক মূল্যবোধকে তুলে ধরাই এই গল্পের মূল লক্ষ্য।]


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।